দেড়মাস পর কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে স্বাধীনতা পেল আরামবাগ টিভি

Spread the love

মোল্লা জসিমউদ্দিন


টানা দেড়মাস জেলবন্দি আরামবাগ টিভির দম্পতি সাংবাদিক সহ ক্যামেরাম্যান।শুক্রবার দুপুরে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিচারপতি অনিরুদ্ধ রায়ের ডিভিশন বেঞ্চ আরামবাগ টিভির তিন সাংবাদিকের জামিন মঞ্জুর করে থাকে। ১০ হাজার টাকার ব্যক্তিগত বন্ডে কলকাতা হাইকোর্টের এই জামিনদান। রাজ্যের শাসক দল এবং পুলিশের একাংশের বিরুদ্ধে লাগাদার নির্ভীক সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে সম্প্রতি ৫ টি জামিন অযোগ্য মামলার শিকার হয়েছিলেন আরামবাগ টিভি নামে এক ইউটিউব নিউজ চ্যানেলের সম্পাদক সেখ শফিকুল ইসলাম, তার স্ত্রী আলেমা বিবি এবং ক্যামেরাম্যান সেখ সুরোজ আলি। ইতিমধ্যেই ৫ টি মামলার মধ্যে ৪ টি তে আগেই জামিন মিলেছিল। সর্বশেষ দাখিল হওয়া মামলায় টানা দেড়মাস জেলবন্দি আরামবাগের এই তিনজন সাংবাদিক। শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিচারপতি অনিরুদ্ধ রায়ের ডিভিশন বেঞ্চে ভার্চুয়াল শুনানিতে উভয় পক্ষের সওয়াল-জবাব শুনে প্রত্যেকের ১০ হাজার টাকার ব্যক্তিগত বন্ডে জামিনের নির্দেশ দেয় হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। আজ অর্থাৎ শনিবার সারাদেশে স্বাধীনতা দিবস করোনা স্বাস্থ্যবিধি বজায় রেখে পালিত হচ্ছে। সেখানে দেশের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে কলকাতা হাইকোর্ট আরামবাগ টিভির নির্ভীক সাংবাদিকতার স্বাধীনতা দিলো বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। যদিও এই মামলার গতবারের শুনানিতে হাইকোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির এজলাসে রাজ্যের ডিজিপির কাছে আরামবাগ টিভির তিন সাংবাদিক গ্রেপ্তারের বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করা হয়েছে। ডিজিপি সুপ্রিম কোর্টের উল্লেখিত রায় গুলি আরামবাগ টিভির সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারে রায় লঙ্ঘন করেছে কিনা? তা ডিজিপি উচ্চ আদালত কে কি জানান তার দিকেও সাংবাদিকদের পক্ষে আইনজীবীদের কড়া নজর থাকবে বলে জানানো হয়েছে। সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে সেখ সফিকূল ইসলাম প্রত্যেকেই নির্ভীক সাংবাদিকতা করতে গিয়ে পুলিশের অতি সক্রিয়তার শিকার হয়েছেন। হাজতবাসের পাশাপাশি জুটেছে নানারকম জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা। তবে এরা কেউ দমবার পাত্র নন। দেশের সংবিধানে সংবাদমাধ্যমের ভুমিকা কে সামনে রেখে নির্ভীক সাংবাদিকতার লড়াই চালাচ্ছেন অবিরত। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে বোলপুরের এক সাংবাদিকের দুটি ফৌজদারি মামলায় আগাম জামিনের ক্ষেত্রে বিচারপতি সৌমেন সেন এবং বিচারপতি বিবেক চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ রয়েছে – ‘ বেআইনী কাজ নিয়ে খবর করা সাংবাদিকের মৌলিক অধিকার। প্রশাসনের চোখে ভালো নাও লাগতে পারে। তবে নির্ভীক জনহিতকর সাংবাদিকতা জনগণ কে সচেতন করে ‘। উক্ত দুটি মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ওই সাংবাদিকের আগাম জামিনের আবেদন গ্রহণ করে বীরভূম জেলার এসপি কে দুটি এফআইআর কপি ভালোমতো খতিয়ে দেখবার পাশাপাশি অভিযুক্ত পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেয়। ডিভিশন বেঞ্চ এও জানিয়েছিল আদেশনামায় – ‘যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা সত্য হলে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা   অভিযোগকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ করা উচিত। ঠিক এইরকম পরিস্থিতিতে গত শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির এজলাসে আরামবাগের এক ইউটিউব নিউজ চ্যানেলের ত্রয়ী সাংবাদিক গ্রেপ্তারে স্থানীয় থানার পুলিশের অতিসক্রিয়তা নিয়ে মামলা উঠেছিল। ভার্চুয়াল শুনানিতে আরামবাগ টিভির সম্পাদক সেখ সফিকুল ইসলাম, আলিমা বিবি এবং সুরজ আলি খানের গ্রেপ্তারের বিস্তারিত রিপোর্ট চাওয়া হয়েছিল রাজ্যের ডিজিপির কাছে। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির এই মামলায় পর্যবেক্ষণ ছিল – ‘ তিনজন সাংবাদিক গ্রেপ্তারে দেশের সংবিধান কে লঙ্ঘন করা হয়েছে’।  রাজ্যের ডিজিপি কে চাওয়া রিপোর্টে সুপ্রিম কোর্টের অর্নেশ কুমার – ললিতা কুমারি মামলার রায় এক্ষেত্রে (আরামবাগ টিভি)  লঙ্ঘন হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখে রিপোর্ট তলব করেছিল কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির বেঞ্চ। এফআইআর কপি থেকে গ্রেপ্তারের আগে নোটিশ। পাশাপাশি গভীররাতে রীতিমতো ঘর ভেঙে দুজন শিশু সহ ওই তিনজন সাংবাদিক কে জোরপূর্বক গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় আরামবাগ থানার পুলিশ। যদিও ওই দুই শিশু কে আরামবাগ থানার সামনে রেখে দেয় পুলিশ। যে অভিযোগের ভিক্তিতে গ্রেপ্তার। সেই অভিযোগের ঘটনা টি তিনমাস পুরাতন। এফআইআর কপিতে অবশ্য ওই তিনমাস কেন দেরি হলো অভিযোগ নথিভুক্ত করতে তার উল্লেখ নেই। কোন ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের আগে নোটিশ দিতে হয়।এক্ষেত্রে সেই ফৌজদারি কার্যবিধি মেনে নোটিশ দেওয়া হয়নি৷ গত ২৯ জুলাই রাত ১২ টা নাগাদ অভিযোগপত্র গৃহীত হয়। গৃহীত হওয়ার ঘন্টা খানেকের মধ্যেই আরামবাগ থানার পুলিশ বিশাল পুলিশ বাহিনী এনে রীতিমতো ঘরের প্রধান দরজা ভেঙ্গে জোরপূর্বক গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। পুলিশের এহেন অতিসক্রিয়তায় প্রশ্ন তুলেছিল কলকাতা হাইকোর্ট। কেন এই পুলিশের অতি সক্রিয়তা?  আরামবাগ টিভির পক্ষে আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য,সব্যসাাচী চট্টপাধ্যায় জানিয়েছিলেন – ‘ নিরপেক্ষ এবং নির্ভীক সংবাদ পরিবেশনে আরামবাগ টিভি জেলার গন্ডি ছড়িয়ে রাজ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।  করোনা স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখতে লকডাউনের মধ্যেই আরামবাগ থানার সামনে থেকে ৫৭ টি ক্লাব কে গড়ে ১ লক্ষ টাকার রাজ্য সরকারের চেক বিলি হয়। করোনার সময়ে যেখানে জমায়েতে বিধিনিষেধ, সেখানে আরামবাগ থানা কিভাবে এই চেকবিলি কর্মসূচি নিলো? সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত বেশিরভাগ ক্লাবের আবার কোন অস্তিত্ব নেই!  আরামবাগ টিভির সম্প্রচারিত খবরে এগুলি বিস্তারিত দেখানো হয়েছিল। এছাড়া অন্য সংবাদ পরিবেশনে আরামবাগ থানার পুলিশের বালির গাড়িতে তোলাবাজির ছবিও দেখায় এই ইউটিউব নিউজ চ্যানেলটি। এই ইউটিউব নিউজ চ্যানেলে লক্ষাধিক গ্রাহক  থাকায় সারারাজ্য জুড়ে হইচই পড়ে যায়। পঞ্চায়েত সমিতির এক প্রাক্তন সদস্য যার অবাধ যাতায়াত আরামবাগ থানাতে। তিনি আরামবাগ টিভির ত্রয়ী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে গত ২৯ জুলাই রাত ১২ টা নাগাদ  তোলাবাজির অভিযোগ আনেন। তাও তিনমাস আগেকার ঘটনার!  অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই আরামবাগ থানার পুলিশ তিন সাংবাদিক কে গ্রেপ্তার করে অভিযোগপত্র গ্রহণের ঘন্টা খানেকের মধ্যেই! আরামবাগ মহকুমা আদালতে ধৃতদের পেশ করা হলে প্রথম দিকে পুলিশি হেফাজত পরবর্তী ক্ষেত্রে জেল হেফাজত হয় সাংবাদিকদের। কলকাতা হাইকোর্টের বর্ষীয়ান আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য এর মাধ্যমে আরামবাগ থানার পুলিশের বিরুদ্ধে অতিসক্রিয়তা নিয়ে মামলা দাখিল হয়ে থাকে। গত সপ্তাহে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির এজলাসে এই মামলার অনলাইন শুনানি চলেছিল। সেখানে সুপ্রিম কোর্টের বেশকিছু মামলার গ্রেপ্তারি বিষয়ক রায় দেখিয়ে আরামবাগ থানার পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ করার আর্জি রাখেন মামলাকারীরা।তখন হাইকোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির এই মামলায় গ্রেপ্তারের পদ্ধতি নিয়ে রাজ্যের ডিজিপির কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছিলেন । পাশাপাশি এই তিনজন সাংবাদিক গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে দেশের সংবিধান কে লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে মামলার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে কলকাতা হাইকোর্ট।অতি সম্প্রতি বোলপুরের এক সাংবাদিকের আগাম জামিনের মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ নির্ভীক জনহিতকর সাংবাদিকতার গুরুত্ব উল্লেখ করে বীরভূমের এসপি কে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার উপর গত সপ্তাহে কলকাতা হাইকোর্ট   আরামবাগ টিভির সাংবাদিক গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে  বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছিলেন রাজ্যের ডিজিপির কাছে। এতে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে – উচ্চ আদালত না থাকলে নির্ভীক সাংবাদিকতা করতে গিয়ে সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে সেখ সফিকুল ইসলামরা পুলিশের অতি সক্রিয়তায় জেলের চার দেওয়ালেই বছরের পর বছর পচতেন……. ।  ঠিক এইরকম পরিস্থিতিতে শুক্রবার দুপুরে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিচারপতি অনিরুদ্ধ রায়ের ডিভিশন বেঞ্চে আরামবাগ টিভির তিন সাংবাদিকের জামিন বিষয়ক মামলার ভার্চুয়াল শুনানি চলে। সেখানে উভয় পক্ষের সওয়াল-জবাব শুনে প্রত্যেকের দশ হাজার টাকার ব্যক্তিগত বন্ডে আরামবাগ টিভির তিন সাংবাদিকদের জামিন মঞ্জুর করে থাকে কলকাতা হাইকোর্ট। আরামবাগ টিভির তিন সাংবাদিক গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে রাজ্যপাল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কে ট্যুইট করে সরব হয়েছিলেন। পাশাপাশি বুদ্ধিজীবী হিসাবে পরিচিত টলিউডের বিশিষ্ট অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী, চিত্র পরিচালক অর্পণা সেন, সু অভিনেতা কৌশিক সেন, সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অশোক গাঙ্গুলি প্রমুখ রাজ্যের পুলিশের অতি সক্রিয়তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                    

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *