আমেরিকার বুকে গ্রামবাংলার আবহ: আন্তরিকের দুর্গোৎসবে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানবিকতার মেলবন্ধন
আমেরিকার বুকে গ্রামবাংলার আবহ: আন্তরিকের দুর্গোৎসবে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানবিকতার মেলবন্ধন
পিটসবার্গ, পেনসিলভেনিয়া: কলকাতা থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে, আমেরিকার বুকে এ বছরের দুর্গোৎসবে ফুটে উঠল গ্রামবাংলার চেনা ছবি। প্রবাসী বাঙালি সংগঠন ‘আন্তরিক’-এর উদ্যোগে ২৪ ও ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ নোভা ব্যাঙ্কোয়েট হলে অনুষ্ঠিত দুর্গাপুজো হয়ে উঠল বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মিলনের উৎসব। এ বছরের মূল ভাবনা ছিল ‘গ্রামবাংলা’—সেই ভাবনাকে ঘিরেই সেজে উঠেছিল পুজোর অঙ্গন।
পাট, কাপড়, খড়, কুলো, হাতপাখা ও একতারার মতো বাংলার গ্রামীণ জীবনের পরিচিত উপকরণে সাজানো হয়েছিল উৎসবের পরিসর। আলপনা ও লোকজ শিল্পের অনুষঙ্গে তৈরি হয়েছিল বাংলার চেনা আবহ। সাজসজ্জার দায়িত্বে থাকা পূর্বাশা ও তাঁর সহযোগীদের সৃজনশীলতা এবং পরিশ্রমে ‘গ্রামবাংলা’ হয়ে উঠেছিল শিকড়ের সঙ্গে সংযোগের এক সুন্দর মাধ্যম। প্রবাসীদের কাছে এই সাজসজ্জা যেমন স্মৃতির দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনই নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়েছে বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে।
পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিশেষ আকর্ষণ ছিল বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নাচ, গান ও দলগত পরিবেশনায় অংশ নেন বিভিন্ন বয়সের শিল্পীরা। সাংস্কৃতিক সম্পাদক উপাসনা কুমারের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালা তুলে ধরে প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতিচর্চার ধারাবাহিকতা। ছোটদের অংশগ্রহণ এই আয়োজনে যোগ করে বিশেষ মাত্রা—উৎসবের আনন্দের মধ্য দিয়েই তাদের কাছে পৌঁছে যায় বাঙালির শিল্প ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার।
বাঙালির উৎসব যে সুস্বাদু খাবার ছাড়া অসম্পূর্ণ, তারও পরিচয় মিলেছে আন্তরিকের আয়োজনে। ভাপা ইলিশ, কাতলার কালিয়া, কষা মাংস ও শুক্তোর মতো পদে অতিথিরা পেয়েছেন খাঁটি বাঙালি ভোজের স্বাদ। কৌশিক কুণ্ডুর তত্ত্বাবধানে খাবারের আয়োজন উৎসবে যোগ করেছে ঘরোয়া বাঙালিয়ানার উষ্ণতা। চিরচেনা এই স্বাদ প্রবাসের উৎসবকে আরও আপন করে তুলেছে।
সমগ্র আয়োজনের নেতৃত্বে ছিলেন সভাপতি অভিজিৎ মাখাল, সম্পাদক অরিত্র দাস, সহ-সভাপতি অরিজিৎ মুখার্জি, কোষাধ্যক্ষ অভিষেক ভট্টাচার্য এবং সাংস্কৃতিক সম্পাদক উপাসনা কুমার। জনসংযোগের দায়িত্ব সামলেছেন মৌমিতা গোস্বামী এবং সমাজমাধ্যমে প্রচারের দায়িত্বে ছিলেন মেখলা কর। পুজোর আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন অরুণিতা। লজিস্টিকস ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনা সামলেছেন সুমন রায়। সাজসজ্জায় পূর্বাশা, খাবারের আয়োজনে কৌশিক কুণ্ডু এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মিলিত শ্রমে বাস্তব রূপ পেয়েছে এই উৎসব।
উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও গুরুত্ব দিয়েছে আন্তরিক। অভাবী মানুষের সাহায্যার্থে অনুদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার দায়িত্বে ছিলেন তপজিৎ। এই প্রয়াস উৎসবের সঙ্গে যুক্ত করেছে সহমর্মিতা ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা।
আন্তরিকের দুর্গোৎসবের আবেদন একটি শহরের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামবাংলার সাজসজ্জা, বাংলা গান ও নৃত্য, চিরচেনা খাবার এবং উৎসবের উষ্ণতার মধ্য দিয়ে আমেরিকার বুকে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলার আবেগ ও সংস্কৃতি। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে শিকড়ের যোগ গড়ে তোলার পাশাপাশি এমন উদ্যোগ সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বহমান রাখার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। আন্তরিকের এ বছরের দুর্গোৎসব সেই চেতনারই এক সুন্দর প্রকাশ—যেখানে ভৌগোলিক দূরত্ব পেরিয়ে এক হয়েছে ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও মানবিকতা।
