আমাদের দুর্গাপুজো: দেশভাগের স্মৃতি, শিকড়ের টান ও নতুন করে বেঁচে ওঠার ইতিহাস
আমাদের দুর্গাপুজোর ইতিহাস বাংলার প্রথাগত বনেদি বাড়ির পুজোর ইতিহাস থেকে বেশ স্বতন্ত্র। এই পুজো কেবল পারিবারিক ঐতিহ্য বা ধর্মীয় রীতিনীতির ধারাবাহিকতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশভাগের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া ভিটেমাটির টান এবং নতুন করে শিকড় গেড়ে বেঁচে ওঠার এক সংগ্রামী কাহিনি।
১৯৫১ সালে আমাদের পরিবার চট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় চলে আসে। তার আগে পূর্ববঙ্গের সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং দেশভাগের অভিঘাতে মানুষের জীবন ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। ১৯৫০ সালের দাঙ্গা-অশান্তির ক্ষত তখনও গভীর, আর সদ্যগঠিত পাকিস্তানের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষের মনে আরও উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছিল। এই অস্থির সময়ের মধ্য দিয়েই আমাদের পরিবারকে পিছনে ফেলে আসতে হয়েছিল পরিচিত পরিবেশ, স্মৃতিবিজড়িত ভিটেমাটি এবং একান্ত আপন শিকড়ের ঠিকানা।
কলকাতায় এসে শুরু হয়েছিল নতুন করে জীবন গড়ার অধ্যায়। অচেনা শহরে নিজেদের জায়গা তৈরি করা, নতুন করে সংসার সাজানো এবং হারিয়ে যাওয়া পরিচিতির মধ্যে নিজের অস্তিত্বকে ধরে রাখা—সবটাই ছিল এক কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে আমাদের পরিবার বুকে আগলে রেখেছিল অতীতের স্মৃতি, সংস্কার এবং ঐতিহ্যকে।
সেই ধারাবাহিকতাতেই আমাদের দুর্গাপুজো হয়ে ওঠে শুধুমাত্র দেবী আরাধনার উপলক্ষ নয়, বরং অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক গভীর সেতুবন্ধন। এই পুজোর প্রতিটি আচার, প্রতিটি আয়োজন এবং প্রতিটি উৎসবের মুহূর্তে যেন মিশে থাকে ফেলে আসা চট্টগ্রামের স্মৃতি, পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার এবং কলকাতার মাটিতে নতুন করে নিজেদের শিকড় বিস্তারের অদম্য প্রত্যয়।
আমাদের দুর্গাপুজো তাই এক ভাঙা ভূগোল পেরিয়ে বয়ে আনা ঐতিহ্যের নাম—যেখানে দেশভাগের বেদনা মিশেছে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহসে, হারানোর স্মৃতি মিশেছে নতুন করে আপন করে নেওয়ার আনন্দে, আর পারিবারিক উত্তরাধিকার রূপ পেয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান এক জীবন্ত ইতিহাসে।
